মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

।। জেলখানার জিন্দেগী ।।

জেলখানায় নয়া কেউ গেলে তারে পুরানরা জিগাই , মামলা কি ? আমারেও জিগাইছিলো । আমি কইতাম , আইসিটি এক্ট । বেশির ভাগই বুঝতো না । বেশির ভাগই পাল্টা জিগাইতো , ইবা আবার কি মামলা ? আমি কইতাম , ৫৭ ধারা । আবার জিগাইতো , ইবা কি ধারা ? আমি কইতাম , তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি আইন । তারপরেও বেশির ভাগ লোক বুঝতো না আমার অপরাধ কি । বলতো, তুমি করছোটা কি ?

আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি একজন রাজাকার যুদ্ধাপরাধী , রাজাকার যুদ্ধাপরাধীর মেয়ে ছাত্রীসংস্থার সাবেক নেত্রী এবং জামাত থেকে আসা আওয়ামীলীগের এমপির বিরুদ্ধে লিখেছি । তখন বলতো , অহ বুঝছি । তুমি হইলা গিয়া "কলম মার্ডার" । আমি প্রথমে বুঝি নাই । "কলম মার্ডার" কি ? জেলখানায় বেশির ভাগ মামলারই কিছু উপনাম আছে । যেমন আমি গ্রেফতার হইছি , তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি আইনে আর আমার মামলার উপনাম "কলম মার্ডার" । মানে আমি লেখা দিয়া মার্ডার করছি । কলম দিয়াই যেহেতু লেখা তাই তারা নাম দিয়েছে এই "কলম মার্ডার" ।

আমি একদিন , ওয়ার্ড থেকে বাইর হইয়া , সিগারেট ফুকতাছি । যেখানে সিগারেট ফুকতাছি তার পাঁশে "কোরান দফা" । মানে এই ঘরে কোরান তেলোয়াত করা হয় । সকাল আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত ।

কোরান দফা থেকে একজন ছেলে বের হইয়া (প্রায় আমার সমবয়সী) একটা পান নিলো বেশি কইরা জর্দা দিয়া । ছেলেটির পরনে সাদা জুব্বা , মুখে দাড়ি । তারপর আমার পাঁশে আইয়া জিগাইলো, ভাই কি মামলা ? আমি কইলাম, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি একজন রাজাকার যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকার যুদ্ধাপরাধীর মেয়ে ছাত্রীসংস্থার সাবেক নেত্রী এবং জামাত থেকে আসা আওয়ামীলীগের এমপির বিরুদ্ধে লিখেছি ।

ছেলেটি বললো , আওয়ামীলীগ হইলো কুত্তার দল । এরা ইহুদি নসরা । এরা আলেম ওলেমাদার সম্মান দেয় না । আওয়ামীলীগ আলেম ওলেমা বিরোধি । আওয়ামীলীগ ইসলাম বিরোধি । কোন ঈমানন্দার মুসলমান আওয়ামীলীগ করতে পারে না । আওয়ামীলীগ করলেই জাহান্নাম নিশ্চিত । দেলোওয়ার হোসাইন সাইদির মতো একজন আলেমরে যুদ্ধাপরাধী কইয়া জেলে আটকায় রাখছে । কত্ত বড় জালিম এই আওয়ামীলীগ ! আল্লাহর গজব পড়বে এই হাসিনার উপর ! এই নাস্তিক সরকারের পতন একদিন হবেই হবে ! এই জালিম সরকারের পতন একদিন হবেই হবে ।- ইনশাআল্লাহ ।

ছেলেটি আমারে উপদেশের সহিত কইলো, ভাই জামাতের বিরোধিতা করেন সমস্যা নাই কিন্তু আলেমওলেমাদের বিরোধিতা কইরেন না । আল্লাহর গজব পড়বে । রাজাকার যুদ্ধাপরাধী কি আওয়ামীলীগে নাই ? তাদের বিরুদ্ধে লেখেন । আলেমওলেমাদের রাজাকার যুদ্ধাপরাধী কইলে আল্লাহর গজব পড়বে ।

আমি তারে জিগাইলাম ভাই আপনার কি মামলা , ছেলেটি কয় সে চাঁদগাও একটা মাদ্রাসায় হাফেজি পড়াইতো (মানে কোরান পড়াইতো) আর নামাজ কালাম শিখাইতো । ইসলামের দাওয়াত দিতো । কিন্তু স্থানীয় আওয়ামীলীগের লোকেরা এইটা সহ্য করতে পারতো না । তাই তারা ক্ষমতার জোর খাটাইয়া তার মতো একজন আলেমকে জেলে ঢুকাই দিছে । যেনো কোরানের আলো ছড়াইয়া না পরে ।

ছেলেটির মুখে এই কথা শুইনা আমি পুরাই তবদা খাইগেলাম । মনে মনে নিজের লজ্জা হইতে লাগলো । একজন লোক কোরান শিখায় নামাজ কালাম শিখায় আর তারেই আওয়ামীলীগ জেলে ঢুকাই দিলো ! আমিতো জানি আওয়ামীলীগ ইসলাম বিরোধি নয় । কিন্তু এখনতো যা শুনছি তাতে মনে হচ্ছে , আওয়ামীলীগ ইসলাম বিরোধি । ছেলেটির কথা শুইনা আমার নিজের উপর নিজেরই ঘৃণা হইতে লাগলো । কারণ আমি একজন আওয়ামীলীগ সমর্থক । আমি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং জাতির পিতার আদর্শ মনে প্রাণে ধারন করি । লজ্জায় অপমানে আমার বলতে ইচ্ছা করছিলো , হে মাটি তুমি ফাঁক হয়ে যাও আমি ঢুকে যাই ! ছেলেটিকে আর কিছু না বলে , আমি চলে আসলাম আমার ওয়ার্ডে ।

ওয়ার্ডে আইসা বই নিয়া বসলাম । আমার পাশে একজন ছেলে এসে বলল, যে ছেলের সাথে কথা বলছো তুমি তারে চিনো ? আমি বললাম না । আইজই কথা হইলো । ছেলেটি বললো , ও আগে আমাদের এই ওয়ার্ডে থাকতো । এইখানে নামাজ পড়াইতো । এখন এই বিল্ডিংয়ের চারতলায় থাকে ১২ নং ওয়ার্ডে । সেখানে ইমামতি করে । আমি বললাম , ওহ । ছেলেটি বললো , তার মামলা কি জানো ? আমি বললাম , সে কইছে কোরান হাদিস শিখায় বলে তারে আওয়ামীলীগের লোকেরা ক্ষমতার অপব্যবহার কইরা জেলে ঢুকাই দিছে ।

ছেলেটি হাইসা দিয়া কয় , মাদারিচুদ আলা পোদাপোয়া । সেরা ভন্ড । আমি কইলাম কি কন! ছেলেটি কয় , সে চাঁদগাও'তে একটা মাদ্রাসায় হাফেজি পড়াইতো । হাফেজি পড়ানোর সময় একটা ছয় বছরের ছেলেকে তার অফিস রুমে ডেকে নিয়ে যায় । তারপর ছেলেটিকে বলৎকার করার সময় ছেলেটি চিৎকার দিলে বাকি ছাত্ররা দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখে ছেলেটি কাপড় চোপড়হীন অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইছে । হৈচৈ শুরু হলে আশেপাশের লোকজন চলে আসে । তারপর শুরু হয় ব্যাপক মাইর । মাইরের পর তাকে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয় । থানায় নিয়ে গেলে ছেলের বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনে তার বিরুদ্ধে একটা মামলা করে । সেই মামলায় হুজুর এখন প্রায় ১১ মাস জেলখাটছে । শালা "পাছা মার্ডার" । ভন্ডের ভন্ড ।

তারপর আমি বুঝতে পারলাম , একজন অপরাধী তার অপরাধ ঢাকতে ধর্মকে ঢাল হিসাবে কিভাবে ব্যবহার করে । কিভাবে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ধর্ম এবং ধর্মীয় অনুভিতিকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে ।

ছেলেটির নাম জিয়াউর রহমান । বাবার নাম খুব সম্ভবত মাহবুব । বাড়ি পুকুরিয়া (চানপুর) , বাঁশখালী । মাদ্রাসা থেকে পড়াশুনা করে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলো । হেফাজত ইসলামের সে একজন একটিভ কর্মী । আর এখন সে কর্ণফুলি বিল্ডিংয়ের চার তলায় ১২ নং ওয়ার্ডে ইমামতি করে । আর চব্বিশঘন্টা আওয়ামীলীগ এবং সরকারকে ইসলাম বিরোধি নাস্তিক কইয়া লোকোজনরে বুঝায় ।

আইচ্ছা এমন হুজুর কি বাঙালি জাতি কখনোই চাইছিলো ?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন